শেরপুরে অজ্ঞাত রোগে ২০ গরুর মৃত্যু, আতঙ্কে খামারিরা

শেরপুরে গত এক মাসে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। গরুগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা। একের পর এক গরুর মৃত্যুতে এলাকার খামারিদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের তিলকান্দি পূর্বপাড়া ও ভাটিয়াপাড়া গ্রামে ছোট-বড় কয়েকটি গরুর খামার রয়েছে। প্রতিটি খামারে সার্বোচ্চ ১৫ থেকে সর্বনিম্ন ৬টি গরু রয়েছে। এসব খামারে প্রতিটি গাভি প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ লিটার দুধ দেয়। যারই ধারাবাহিকতায় জেলা প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এই দুটি গ্রামকে দুগ্ধগ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে গত ১২ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অজ্ঞাত রোগে ২০টি গরুর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন একাধিক খামারি।

তিলকান্দি গ্রামের জহুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় সবাই গরু পালন করে। গাভির দুধ বিক্রি করে অনেকের সংসারও চলে। আমি পেশায় একজন কৃষক। অনেক কষ্ট করে ৫০ হাজার টাকা জমিয়ে একটি ষাঁড় কিনেছিলাম। চিন্তা করেছিলাম কোরবানির ঈদে বিক্রি করব। কিন্তু অজ্ঞাত এক রোগে আমার গরুটি মারা গেছে। গরুটির হঠাৎ করে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ও শ্বাসকষ্ট ছিল। এরপর মুখ দিয়ে লালা ঝরতো।

আরেক খামারি হাশেম মিয়া বলেন, আমি চারটি গরু নিয়ে খামার শুরু করি। কিন্তু গত কয়েকদিনে আমার খামারের তিনটি গাভি মারা গেছে। আমি গরিব মানুষ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গরু পালন শুরু করেছিলাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমার প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।

খামারি মনিরুজ্জামান মনির অভিযোগ করে বলেন, আমাদের এলাকায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি গরু মারা গেছে। কেউ যদি আমাদের কাছে প্রমাণ চায়। তাহলে আমরা কবর খুঁড়ে খুঁড়ে তার প্রমাণ দিতে পারব।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোনো সহযোগিতা পাইনি। গরুর অসুস্থতার কথা জানিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে ফোন দিলে তারা সকালের কথা বলে বিকেলে আসেন। আসার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা নিয়ে চলে যান। তারা যাওয়ার পরপরই গরু মারা যায়। কিন্তু কী কারণে গরুগুলো মারা যাচ্ছে তারা এখন পর্যন্ত সেটি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সদর উপজেলা কৃষক সমিতির সভাপতি সোলাইমান আহমেদ বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক যেহেতু প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এই গ্রাম দুগ্ধগ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাহলে এই গ্রামের খামারিদের বিপদে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের পাশে থাকা দরকার ছিল। তারা সেটি না করে গরুর মৃত্যুর পর খামারিদের দিয়েই ময়নাতদন্ত শেষ করে। গরুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে গিয়েই তাদের কর্তব্য শেষ করছে। খামারিরা গরুর মৃত্যুর কারণে এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, তারপর তাদের কাছ থেকে তিন থেকে চার হাজার টাকা নিচ্ছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের লোকজন।

স্থানীয় পশু চিকিৎসক শাহাদৎ হোসেন জানান, গরুগুলো দেখে মনে হয়েছে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত। প্রায় সব গরুই আক্রান্ত হওয়ার পর হাঁপাচ্ছিল এবং শ্বাসকষ্ট ছিল। সামনে থেকে পেছনে অথবা পেছন থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল। একপর্যায়ে খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং আক্রান্তের দুই-এক দিনের মাথায় মারা যায়।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পলাশ কান্তি দত্ত বলেন, আমরা মৃত গরুগুলোর প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠিয়েছি। পরীক্ষার ফলাফল পেলে গরুগুলোর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি খাদ্যে বিষক্রিয়াজনিত কারণে গরুগুলো মারা গেছে। আপাতত খামারিদের কিছু খাবার বন্ধ রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, অনেক সময় জরুরি মুহূর্তে গরুর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রয়োজন হয়। তখন হয়তো প্রাণিসম্পদ অফিসের কেউ ওষুধ কিনে নিয়ে গরুর শরীরে ব্যবহার করেছে। তাই সে টাকা তারা খামারিদের কাছ থেকে নিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ