ড্রেজারের গর্জনে গিলছে আড়িয়াল খাঁ: ঘর-জমি হারিয়ে কাঁদছে শত পরিবার​

সিনিয়র রিপোর্টার, মাদারীপুর
প্রকাশের সময়: Monday, 13 July, 2026 । 7:15 pm

একসময় ছিল ভরা গোয়াল, ফসলে ভরা জমি আর স্বচ্ছল সংসার। আজ তার সবকিছুই কেবলই স্মৃতি। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াল ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন অন্যের জমিতে আশ্রিত মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের মো. এনামুল আকন (৪৮)। তাঁর মতো আরও শতাধিক পরিবার প্রতিদিন বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলনের কারণেই নদীর গতিপথ বদলে গেছে, যার ফলে শুরু হয়েছে এই ভয়াবহ ভাঙন।​ এক রাক্ষুসে ড্রেজার, শত পরিবারের দীর্ঘশ্বাস​ ভুক্তভোগী এনামুল আকন জানান, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে নদী তাদের জমি গিলতে শুরু করে। সর্বশেষ পৈতৃক সূত্রে পাওয়া শেষ দুই বিঘা জমি ও বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে তিনি স্থানীয় সাইফুল ইসলামের মাত্র আট শতাংশ জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। চোখে জল নিয়ে এনামুল বলেন:​ “যদি ড্রেজার দিয়ে বালু না তোলা হতো, তাহলে এভাবে নদী ভাঙত না। যারা এসব করছে তারা খুবই প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে রাতে হামলার ভয় থাকে। তাই মুখ খুলতেও ভয় পাই। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই। “​একই গ্রামের টিটল আকনের জীবনেও নেমে এসেছে একই ট্র্যাজেডি। গোলাভরা ধান আর ফসলি জমি হারিয়ে বাধ্য হয়ে নদীর ওপারে নিজের সামান্য ছয় শতাংশ জমিতে নতুন করে ঘর তুলেছেন তিনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের এলাকায় আগে কখনো নদীভাঙন ছিল না। ড্রেজার বসানোর পর থেকেই ভাঙন শুরু হয়েছে। যারা বালু তোলে, তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস কারও নেই। “​ভাঙনের মানচিত্রে বিলীন হচ্ছে গ্রাম​। আড়িয়াল খাঁ নদী মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়ন এবং কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বর্তমানে হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের স্থায়ী ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হাটবাজার।​ শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজারে বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীর ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবার ইতিমধ্যে পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হবে।​ ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নদীর পাড়ে আমরা কয়েকজন মিলে একটি বরই ও আমের বাগান করেছিলাম। কিন্তু শামীম আকন নামের একজন নদীর পাড়ের মাটি ড্রেজার মালিকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ায় পুরো বাগানটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাধা দিতে গেলে সে লোকবল নিয়ে মারতে আসে। আতঙ্কে শিশুরা​নদীভাঙনের ধাক্কায় চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক সামাজিক স্থাপনা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। স্থানীয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জানায়, নদী যেভাবে ভাঙছে তাতে নৌকায় করে স্কুলে যেতে তাদের চরম ভয় করে। এই আতঙ্কে অনেকেই এখন আর স্কুলেই যেতে চায় না।​এদিকে রাতভর ড্রেজারের কানফাটানো শব্দে স্থানীয় মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, “রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। কিছু বলতে গেলে উল্টো ভয় দেখানো হয়। ” অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংবাদ প্রকাশ হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয় না, উল্টো তাদের বিপদে পড়তে হয়।​জনপ্রতিনিধিরাও অসহায়​ হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “বালু উত্তোলনকারীরা অনেক প্রভাবশালী। আমি প্রতিবাদ করলে আমার ওপরও হামলার আশঙ্কা আছে। “​এ বিষয়ে ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তাঁকে অবহিত করেনি বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।​প্রশাসনের আশ্বাস ও কঠোর বার্তা​মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পেলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।​মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, “অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন সময়ে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”​জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তার এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পৃথক ম্যাজিস্ট্রেট টিম নিয়মিত মাঠে কাজ করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই তৎপরতা চলমান থাকবে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও আড়িয়াল খাঁর তীরে দাঁড়িয়ে এখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের একটাই প্রশ্ন—অবৈধ ড্রেজারের এই রাক্ষুসে গর্জন থামবে কবে? নাকি ড্রেজার বন্ধ হওয়ার আগেই নদী গিলে খাবে এই নিঃস্ব জনপদের শেষ আশ্রয়টুকুও?

জাগো সংবাদ/আরাফাত/এসএম তানবীর

সম্পাদক ও প্রকাশক: সোলাইমান ফোন: 01810-546098 ই-মেইল: janatarchokh@gmail.com

প্রিন্ট করুন