ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে সাহায্যের আকুতি

ভয়াবহ ভূমিকম্পের আঘাতে কার্যত বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের একটি অংশ। রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন আরও দেড় হাজারের বেশি।

এই পরিস্থিতিতে বিপর্যয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন জানিয়েছে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

গতকাল বুধবার দিনের প্রথম দিকে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের আঘাতে কেঁপে ওঠে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় খোস্ত শহর থেকে ৪৪ কিলোমিটার দূরে ছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস। যার গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫১ কিলোমিটার।

এদিকে ইউরোপীয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএসএসসি) জানায়, উৎপত্তিস্থল থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরেও ভূমকম্পটির তীব্রতা অনুভূত হয়, যার প্রভাব পড়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের অন্তত ১২ কোটি মানুষের ওপর।

বিবিসি বলছে, ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে আফগানিস্তানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং অন্তত দেড় হাজার আহত হয়েছেন। এছাড়া অজ্ঞাত সংখ্যক মানুষ মাটির তৈরি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন।

ভূমিকম্পে দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব পাকতিকা প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং জাতিসংঘ জরুরি আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা প্রদানের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। তবে ভারী বর্ষণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাবে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষ ও উদ্ধারকারীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে বহু গ্রাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া এসব এলাকার বহু রাস্তা এবং মোবাইল ফোন টাওয়ার বিধ্বস্ত হয়েছে। আর তাই মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

গত দুই দশকের মধ্যে আফগানিস্তানে আঘাত হানা ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ভূমিকম্প ছিল বুধবারেরটি। আর এই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলা করাই এখন তালেবানের বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

বিবিসি বলছে, গত বছরের আগস্টে পশ্চিমা-সমর্থিত সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসা তালেবানের অধীনে আফগানিস্তান তীব্র মানবিক সংকটে জর্জরিত অবস্থায় রয়েছে। আর এই ভূমিকম্প তাদেরকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

তালেবানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আব্দুল কাহার বালখি বিবিসিকে বলেছেন, আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার ‘আর্থিকভাবে জনগণকে প্রয়োজনীয় পরিমাণে সহায়তা করতে অক্ষম’। আর তাই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা, প্রতিবেশী দেশসহ বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশগুলোর কাছে আরও বেশি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা, প্রতিবেশী দেশ ও বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশগুলো আমাদের সহায়তা করছে। কিন্তু বিপর্যয় মোকাবিলায় এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো দরকার। কারণ গত কয়েক দশকে এমন বিধ্বংসী ভূমিকম্প আর দেখা যায়নি।’

জাতিসংঘের প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, আফগানিস্তানে দুর্যোগ মোকাবিলায় বৈশ্বিক এই সংস্থাটি ‘পুরোপুরি সক্রিয়’ হয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খাদ্য এবং জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ভূমিকম্প-পীড়িত অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে।

বিবিসি বলছে, বুধবারের ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশের গায়ান ও বারমাল জেলায়। গায়ানের একটি পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া শাবির নামে এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় একটা গর্জন হচ্ছিল এবং আমার বিছানা কাঁপতে শুরু করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভূমিকম্পের তীব্রতায় ছাদ নিচে ভেঙে পড়ে। আমি ওই ঘরে আটকা পড়েছিলাম, সেখান থেকেই আকাশ দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার কাঁধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মাথায়ও আঘাত লাগে। কিন্তু আমি বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। আমি নিশ্চিত যে ওই একই ঘরে থাকা আমার পরিবারের সাত বা নয় জন মারা গেছেন।’

আফগানিস্তান ভূমিকম্প প্রবণ দেশ। কারণ এই দেশটি ভূতাত্ত্বিকভাবেই এমন একটি সক্রিয় অঞ্চলেই অবস্থিত। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিট্রিয়ান অ্যাফেয়ার্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে ভূমিকম্পে ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আর ভূমিকম্পের কারণে দেশটিতে বছরে গড়ে মৃত্যু হয় ৫৬০ জনের।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

আপনার মতামত প্রকাশ করুন

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ